শেষ চিঠি | আবেগঘন বাংলা গল্প | মা ও সন্তানের ভালোবাসা | shesh chithi bangla emotional story

 শেষ চিঠি

ভালোবাসা, অনুশোচনা ও মায়ের অমলিন স্মৃতির এক হৃদয়ছোঁয়া গল্প।

বিকেলের শেষ আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মেঝেতে পড়ছিল। ছোট্ট ঘরটার এক কোণে বসে পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুলছিল রায়হান। মা মারা যাওয়ার পর এই বাক্সে কেউ হাত দেয়নি। বাক্সের ভেতরে ছিল কিছু পুরোনো শাড়ি, কয়েকটি সাদা-কালো ছবি, আর একটি হলুদ হয়ে যাওয়া খাম।

খামের ওপরে লেখা ছিল— "আমার ছেলে রায়হানের জন্য।"

রায়হানের হাত কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে খামটা খুলে ভেতরের চিঠিটা বের করল।


"বাবা,

যখন তুমি এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার পাশে থাকব না। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো— মানুষ কখনো সত্যিকারের একা হয় না। তার ভালো কাজ, তার ভালোবাসা আর তার স্মৃতিগুলো সবসময় তার সঙ্গে থাকে।"

চিঠির প্রথম লাইন পড়েই রায়হানের চোখ ভিজে গেল।

ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মা একাই তাকে বড় করেছিলেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে, নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দিয়ে, কখনো নতুন কাপড় না কিনে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছিলেন। অথচ রায়হান বড় হয়ে চাকরি পাওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল।

ব্যস্ততা, বন্ধু, অফিস—সবকিছুর ভিড়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছিল।

মা ফোন করতেন।

— "বাবা, কেমন আছিস?"

— "ভালো আছি মা। পরে কথা বলি, মিটিং আছে।"

এই "পরে" আর কখনো আসেনি।

একদিন অফিসে ব্যস্ত থাকার সময় প্রতিবেশীর ফোন এলো।

"রায়হান, তোমার মা খুব অসুস্থ।"

সে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

মা শুধু একবার দরজার দিকে তাকিয়েছিলেন। যেন শেষবারের মতো ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন।

সেদিন থেকেই রায়হানের জীবনে এক অদৃশ্য শূন্যতা নেমে আসে।


চিঠির পরের অংশে লেখা ছিল—

"তুমি যদি কোনোদিন মনে করো, আমি তোমার ওপর রাগ করে চলে গেছি, তাহলে ভুল ভাববে। মায়েরা কখনো সন্তানের ওপর রাগ করে থাকতে পারে না। শুধু একটা কষ্ট ছিল— তোমার সঙ্গে আরও একটু সময় কাটাতে পারলাম না।"

রায়হান চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল।

সেই রাতে সে ঘুমাতে পারেনি।

পরদিন সকালে মায়ের ব্যবহৃত চশমাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল।

তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসগুলো টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

একটি মায়ের অপেক্ষা...

একটি বাবার পরিশ্রম...

একটি পরিবারের ভালোবাসা...

এসব হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।


দিন কয়েক পর রায়হান একটা সিদ্ধান্ত নিল।

প্রতি শুক্রবার সে বৃদ্ধাশ্রমে যাবে।

যেসব মা-বাবার সন্তানেরা তাদের ভুলে গেছে, তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাবে।

প্রথম দিন বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে এক বৃদ্ধা তার হাত ধরে বললেন,

"বাবা, তুমি কি আমার ছেলের মতো একটু বসবে?"

রায়হান মাথা নাড়ল।

দুই ঘণ্টা ধরে তিনি শুধু নিজের ছেলের গল্প শুনিয়েছিলেন।

বিদায়ের সময় বৃদ্ধা বললেন,

"আজ অনেক দিন পর মনে হলো আমি আবার মা হয়েছি।"

রায়হানের চোখ আবার ভিজে উঠল।

সে বুঝল, পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা শুধু একটু সময় আর একটু ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকে।


মাস কেটে গেল।

রায়হান নিজের জীবনের অনেক কিছু বদলে ফেলল।

অফিস শেষে আর অকারণে সময় নষ্ট করত না।

আত্মীয়দের খোঁজ নিত।

বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করত।

প্রতিবেশীদের সাহায্য করত।

কারণ সে বুঝেছিল—

জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ ব্যাংকের টাকার অঙ্ক নয়, মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা।


একদিন অফিসে নতুন যোগ দেওয়া এক সহকর্মী বললেন,

"আপনি সবসময় এত হাসিখুশি থাকেন কীভাবে?"

রায়হান একটু হেসে উত্তর দিল,

"আমি একসময় খুব বড় একটা ভুল করেছিলাম। এখন চেষ্টা করি, যেন আর কোনো মানুষ আমার কারণে একা অনুভব না করে।"

সহকর্মী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রায়হান আর কিছু বলল না।

কিছু গল্প শব্দে বলা যায় না।

কিছু অনুশোচনা শুধু চোখের জলেই প্রকাশ পায়।


বছর ঘুরে আবার সেই দিন এল, যেদিন মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

রায়হান মায়ের কবরের পাশে বসে একটি নতুন চিঠি লিখল।

"মা,

ক্ষমা করো। আমি বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছি। তুমি আমাকে মানুষ হতে শিখিয়েছিলে, কিন্তু আমি মানুষ হওয়ার অর্থটা অনেক পরে বুঝেছি।

আজ আমি চেষ্টা করি, তোমার শেখানো ভালোবাসা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। যদি কোথাও থেকে আমাকে দেখতে পাও, তাহলে শুধু এইটুকু জেনো— তোমার ছেলে আজও তোমাকে প্রতিদিন মনে করে।

তোমার জন্যই আমি আজও ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি।"

চিঠিটা কবরের পাশে রেখে সে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

হালকা বাতাস বইছিল।

গাছের পাতাগুলো কাঁপছিল।

রায়হানের মনে হলো, যেন মা আগের মতোই বলছেন—

"ভালো থেকো বাবা। মানুষের পাশে থেকো।"

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেলল।

কারণ সে জানত, পৃথিবীতে কিছু সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের ভালোবাসা থেকে যায় প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি প্রার্থনায়, প্রতিটি ভালো কাজে।

আর সেই ভালোবাসাই একদিন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়ে ওঠে।

নীতিকথা: জীবনের ব্যস্ততার মাঝে যাদের জন্য আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি— বাবা-মা, পরিবার ও প্রিয় মানুষদের সময় দিন। কারণ হারিয়ে যাওয়ার পর অনুশোচনা থাকে, কিন্তু সময় আর ফিরে আসে না।

 

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url