শেষ চিঠির ঠিকানা | হৃদয়ছোঁয়া বাংলা গল্প

গল্পের নাম: শেষ চিঠির ঠিকানা  

 

বর্ষার শেষ বিকেল। আকাশে মেঘের ভাঁজ, মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের চিকচিক। ছোট্ট শহর শান্তিনগরের পুরোনো ডাকঘরটি যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুড়িয়ে গেছে। এখন আর কেউ খুব একটা চিঠি পাঠায় না। সবাই মোবাইল আর ইন্টারনেটেই ব্যস্ত।

কিন্তু ডাকঘরের এক কোণে বসে প্রতিদিন একজন মানুষ একই কাজ করে চলেছেন। তাঁর নাম আবদুল করিম। বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও সপ্তাহে কয়েক দিন তিনি পুরোনো ডাকঘরে এসে বসেন। কারণ এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি।

করিম সাহেবের একমাত্র মেয়ে নীলা। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে চিঠি লেখার অদ্ভুত অভ্যাস ছিল তার। যখন নীলা কলেজে পড়ত, তখনও সে বাবাকে চিঠি লিখত, যদিও তারা একই শহরে থাকত। করিম সাহেব বলতেন, “মুখের কথা ভুলে যায়, কিন্তু চিঠির কালি কখনো মুছে যায় না।”

বছর দশেক আগে নীলা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যায়। প্রথম প্রথম নিয়মিত চিঠি আসত। তারপর ধীরে ধীরে চিঠি কমে যায়। একসময় শুধু ই-মেইল, তারপর ভিডিও কল। কিন্তু করিম সাহেব সেই কাগজের গন্ধটাই বেশি ভালোবাসতেন।

একদিন হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

ফোন বন্ধ।

ই-মেইল বন্ধ।

মেয়েদের সাদা স্রাবের সমস্যা: কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

বুকের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা, নিয়ম ও সমস্যা সমাধান | Breastfeeding Guide

যৌন শক্তি বৃদ্ধির উপায় | যৌন দুর্বলতা দূর করার প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সমাধান 

সোশ্যাল মিডিয়াতেও কোনো খোঁজ নেই।

সবাই বলেছিল, হয়তো নতুন জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

কিন্তু একজন বাবা কখনো বিশ্বাস করতে পারেননি যে মেয়ে তাঁকে ভুলে যেতে পারে।

তাই আজও তিনি প্রতিদিন ডাকঘরে এসে বসেন।

হয়তো কোনো দিন একটা চিঠি আসবে...

...

একই শহরের অন্য প্রান্তে থাকে আরেকজন মানুষ—আরিফ। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও কোনো চাকরি পায়নি। সংসারের অভাব, বাবার অসুস্থতা আর নিজের ব্যর্থতা মিলিয়ে জীবনটা যেন থেমে গেছে।

একদিন হঠাৎ বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে সে সেই পুরোনো ডাকঘরে ঢুকে পড়ে।

ভেতরে ঢুকেই দেখে বৃদ্ধ একজন মানুষ পুরোনো খামগুলো পরিষ্কার করছেন।

আরিফ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—চাচা, এখনো কি কেউ চিঠি পাঠায়?

করিম সাহেব হেসে বললেন,

—কম পাঠায়, কিন্তু যেগুলো আসে, সেগুলোর মূল্য অনেক বেশি।

আরিফ বলল,

—এখন তো সবাই মোবাইলে কথা বলে।

—হ্যাঁ। কিন্তু মোবাইলের কথার কোনো গন্ধ নেই। চিঠির থাকে।

এই অদ্ভুত উত্তর শুনে আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

সেদিনের পর থেকে প্রায়ই সে ডাকঘরে যেতে শুরু করল।

ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্ব তৈরি হলো।

...

একদিন করিম সাহেব আরিফকে একটি কাঠের পুরোনো বাক্স দেখালেন।

বাক্সের ভেতরে শত শত চিঠি।

কেউ প্রেমপত্র লিখেছে।

কেউ মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছে।

কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শেষ চিঠি পাঠিয়েছে।

আবার এমনও চিঠি আছে, যেগুলো কখনো তাদের গন্তব্যে পৌঁছায়নি।

আরিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—এগুলো এখনো রেখে দিয়েছেন?

করিম সাহেব বললেন,

—এগুলো শুধু কাগজ নয়। মানুষের জীবন।

তারপর একটি হলুদ হয়ে যাওয়া খাম বের করলেন।

খামের ওপর লেখা—

"আমার বাবার জন্য"

ভেতরে ছিল নীলার লেখা শেষ চিঠি।

চিঠিতে লেখা ছিল—

"বাবা, যদি কোনো দিন আমি অনেক দূরে চলে যাই, তবুও বিশ্বাস করবেন আমি আপনাকে ভুলব না। মানুষের জীবনে অনেক ঝড় আসে। কিন্তু আপনার শেখানো সাহস আমাকে সব সময় বাঁচিয়ে রাখবে..."

চিঠির বাকিটা ভিজে গিয়েছিল।

সম্ভবত চোখের জলে।

...

সেই রাতেই আরিফ বাড়ি ফিরে ঘুমাতে পারল না।

তার মনে হতে লাগল, পৃথিবীতে হয়তো হাজারো মানুষ আছে যারা কোনো উত্তর না পাওয়া চিঠির মতো অপেক্ষা করে যাচ্ছে।

হয়তো তাদের কাউকে একটু সাহস দিলেই জীবন বদলে যেতে পারে।

পরদিন সে সিদ্ধান্ত নিল একটি অভিনব কাজ করবে।

সে শহরের মানুষের জন্য একটি "চিঠির দেয়াল" বানাবে।

যেখানে যে কেউ নিজের মনের কথা লিখে ঝুলিয়ে রাখতে পারবে।

যে চিঠির কোনো ঠিকানা নেই, সেটাও।

প্রথম দিন মাত্র তিনটি চিঠি এল।

দ্বিতীয় দিন বারোটি।

এক সপ্তাহের মধ্যে শতাধিক।

কেউ মৃত বাবাকে লিখেছে।

কেউ পুরোনো প্রেমকে।

কেউ নিজের ছোটবেলার নিজেকেই।

চিঠির দেয়ালটি ধীরে ধীরে পুরো শহরের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল।

...

এক বিকেলে ডাকঘরে হঠাৎ একজন বিদেশি কুরিয়ার কর্মী এসে একটি খাম রেখে গেল।

খামের ওপর বড় অক্ষরে লেখা—

"শুধু আবদুল করিমের হাতে পৌঁছাবে।"

করিম সাহেবের হাত কাঁপতে শুরু করল।

তিনি ধীরে ধীরে খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি মাত্র কাগজ।

আর তার সঙ্গে একটি পুরোনো ছবি।

ছবিতে ছোট্ট নীলা বাবার হাত ধরে হাসছে।

কাগজে মাত্র দুটি লাইন—

"বাবা, আমি ফিরছি। তবে হয়তো আপনি আমাকে আগের মতো চিনতে পারবেন না..."

চিঠির নিচে কোনো ঠিকানা নেই।

কোনো ফোন নম্বর নেই।

শুধু একটি তারিখ।

আর সেই তারিখটি ছিল... আগামীকাল।


পরদিন সকাল থেকেই আবদুল করিম সাহেবের চোখ বারবার ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল। রাতভর তাঁর ঘুম হয়নি। মাত্র দুটি লাইন লেখা একটি চিঠি যেন তাঁর দশ বছরের অপেক্ষাকে আবার নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

"বাবা, আমি ফিরছি। তবে হয়তো আপনি আমাকে আগের মতো চিনতে পারবেন না..."

এই কথার অর্থ কী?

কেন তিনি চিনতে পারবেন না?

আর এত বছর পর হঠাৎ এই ফিরে আসা কেন?

আরিফও সেদিন খুব সকালে ডাকঘরে চলে এল। করিম সাহেবের মুখে উদ্বেগ আর আশার অদ্ভুত মিশ্রণ দেখে সে বুঝতে পারছিল, আজকের দিনটা অন্য রকম।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।

প্রতিটি বাস থামলেই করিম সাহেব উঠে দাঁড়াচ্ছেন। প্রতিটি রিকশা এলেই তাঁর চোখে একরাশ আশা জেগে উঠছে। কিন্তু আবার হতাশা।

ঠিক সূর্য ডোবার আগে একটি সাদা গাড়ি ডাকঘরের সামনে এসে থামল।

গাড়ি থেকে নামলেন প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের এক নারী। তাঁর মাথায় হালকা ওড়না, মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখ দুটো অদ্ভুত পরিচিত।

নারীটি কয়েক পা এগিয়ে এসে থেমে গেল।

করিম সাহেব তাকিয়ে রইলেন।

দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না।

তারপর নারীটি ধীরে ধীরে বলল,

—বাবা...

শব্দটি শোনামাত্র করিম সাহেবের চোখ ভিজে উঠল।

—নীলা!

তিনি ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

কিন্তু জড়িয়ে ধরতেই তিনি টের পেলেন, নীলার শরীর খুব দুর্বল। তার মুখে আগের সেই হাসি নেই।

কিছুক্ষণ পর সবাই ডাকঘরের ভেতরে বসল।

করিম সাহেব কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

—মা, এত বছর কোথায় ছিলে? একটা খবরও দিলে না কেন?

নীলা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।

—বাবা, আমি ইচ্ছে করে হারিয়ে যাইনি।

সে বলতে শুরু করল।

বিদেশে পড়াশোনার সময় একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় সে গুরুতর আহত হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক মাস কোমায় ছিল। জ্ঞান ফেরার পর স্মৃতিশক্তির অনেকটাই হারিয়ে যায়। নিজের নাম পর্যন্ত মনে করতে পারত না।

হাসপাতাল, চিকিৎসা আর পুনর্বাসনে কেটে যায় অনেক বছর।

ধীরে ধীরে কিছু স্মৃতি ফিরে এলেও বাবার ঠিকানা, পুরোনো ফোন নম্বর—সব হারিয়ে গিয়েছিল।

একদিন পুরোনো একটি বাক্স গোছাতে গিয়ে সে নিজের লেখা সেই চিঠিগুলো খুঁজে পায়।

চিঠির প্রতিটি লাইন যেন তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির দরজা খুলে দেয়।

সে মনে করতে শুরু করে—

শৈশব...

ডাকঘর...

বাবার হাসি...

বৃষ্টির দিনে একসঙ্গে চিঠি লেখা...

তারপর অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে পুরোনো ডাকঘরের ঠিকানা খুঁজে পায়।

কিন্তু দেশে ফেরার আগেই চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার কারণে তার হৃদ্‌যন্ত্র খুব দুর্বল হয়ে গেছে।

অপারেশন দরকার।

সফলও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

তাই সে ভয় পেয়েছিল।

যদি বাবাকে দেখার আগেই কিছু হয়ে যায়?

সেই কারণেই সে প্রথমে শুধু একটি ছোট চিঠি পাঠিয়েছিল।

করিম সাহেব নীরবে সব শুনছিলেন।

তারপর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তুই ফিরে এসেছিস, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।


পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে নীলা ধীরে ধীরে আগের জীবনে ফিরে আসতে শুরু করল।

এদিকে আরিফের "চিঠির দেয়াল" সারা শহরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

মানুষ সেখানে নিজের না বলা কথাগুলো লিখে রেখে যায়।

একদিন নীলা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে একটি চিঠি লিখল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

"যদি কোনো দিন মনে হয় জীবনে আর কেউ নেই, তাহলে বাড়ি ফিরে যাও। হয়তো কেউ একজন এখনো প্রতিদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।"

চিঠিটি পড়ে অনেকেই চোখের জল লুকাতে পারেনি।


কয়েক মাস পরে করিম সাহেব ও নীলা মিলে সেই পুরোনো ডাকঘরের একটি অংশকে ছোট্ট একটি 'চিঠি জাদুঘর' বানিয়ে ফেললেন।

সেখানে রাখা হলো বহু বছরের পুরোনো চিঠি, পোস্টকার্ড, ডাকটিকিট আর মানুষের গল্প।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সেখানে আসতে শুরু করল।

তারা শিখল—

একটি চিঠি শুধু কয়েকটি শব্দ নয়।

এটি একজন মানুষের অনুভূতি, অপেক্ষা, ভালোবাসা আর স্মৃতির সাক্ষী।


একদিন আরিফ জিজ্ঞেস করল,

—চাচা, এত বছর অপেক্ষা করে কখনো কি মনে হয়নি, নীলা আর ফিরবে না?

করিম সাহেব মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,

—যে ভালোবাসা সত্যি হয়, সে কখনো শেষ হয় না। কখনো চিঠি হয়ে ফিরে আসে, কখনো মানুষ হয়ে।


সেদিন সন্ধ্যায় ডাকঘরের দরজায় একটি নতুন বোর্ড টাঙানো হলো।

তাতে লেখা ছিল—

"শেষ চিঠির ঠিকানা নয়, প্রতিটি সত্যিকারের ভালোবাসারই একটি ঠিকানা থাকে। শুধু পৌঁছাতে সময় লাগে।"

বৃষ্টি আবার শুরু হলো।

ডাকঘরের টিনের ছাদে টুপটাপ শব্দ পড়ছে।

করিম সাহেব, নীলা আর আরিফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলেন।

করিম সাহেব পকেট থেকে একটি সাদা খাম বের করে নীলার হাতে দিলেন।

নীলা অবাক হয়ে বলল,

—এটা কী?

করিম সাহেব হেসে বললেন,

—এটা তোমার জন্য লেখা আমার প্রথম চিঠি। কোনো দিন পাঠাতে পারিনি।

নীলা খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র একটি লাইন—

"পৃথিবী যত বড়ই হোক, সন্তানের জন্য বাবার অপেক্ষার ঠিকানা কখনো বদলায় না।"

চিঠিটি পড়ে নীলা বাবার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।

ডাকঘরের পুরোনো ঘড়িটি তখন সন্ধ্যা ছয়টা বাজাচ্ছিল।

আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, দশ বছরের অপেক্ষা যেন অবশেষে নিজের ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।

—সমাপ্ত—

===============

 

আজ কোর্টের ১৭ নম্বর এজলাসে এক অভিনব কেস উঠেছে। এক ভদ্রমহিলা জীবনের মধ্যাহ্ন পেরিয়ে এসে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হতে চান, নিঃশর্তে। অথচ, স্বামী তার স্ত্রীকে কিছুতেই ছাড়তে চান না।

বিষয়টা এইরকম -- চাকরিরতা স্ত্রী, বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছে, হঠাৎ করেই ইচ্ছেপ্রকাশ করলেন যে, আর সংসার করবেন না তিনি। 


সংসার করতে তার আর ভালো লাগছে না। তাই, সব কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করতে নিঃশর্তে ডিভোর্স চাইছেন দাম্পত্য জীবন থেকে। কিন্তু স্বামী চান, স্ত্রীর সাথে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটাতে। একমাত্র মেয়ে তার নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তাই জীবনের বাকি সময়টা স্ত্রীয়ের সাথে একান্তে, আনন্দে কাটিয়ে দিতে চান তিনি।

কোর্টের চত্বরে বিশাল কৌতূহল -- বিচারক কার পক্ষে রায় দেবেন। কার দলিল কতটা পোক্ত জেতার জন্য।

শঙ্খনীল আর অনুপমা, দাম্পত্য জীবনের পঁচিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন একসাথে। একটি মাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে গড়ে ওঠা তাদের সংসারে কেউ কখনো অশান্তি দেখেনি। বাইরে থেকে সবাই জানতো এরা সবাই সুখী। এমনকি, শঙ্খনীল - অনুপমার বন্ধুমহলে ওরা স্বামী - স্ত্রী হিসেবে সেরা দম্পতির একটা উদাহরণও ছিল। সেই দম্পতির এমন কাহিনী যেন মেনে নেওয়া যায় না। পঁচিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে যখন মানুষ রজত জয়ন্তী বিবাহবার্ষিকী পালন করেন, ঠিক সেই সময়েই অনুপমার এমন আইনি আপিল।
বিচারক জিজ্ঞেস করলেন অনুপমাকে, "আপনার স্বামী কি পরকীয়া করেন? "
অনুপমার উত্তর, "বর্তমানে আমার স্বামীর জীবনে আমি ছাড়া কেউ নেই। আমিই তার সবচেয়ে কাঙ্খিত নারী। "
বিচারক আবারও জিজ্ঞেস করেন, "তাহলে উনি কি অত্যাচারী? ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স হয় আপনার সাথে? "
অনুপমা হেসে বলল, "মোটা টাকা মাইনে পাওয়া বৌয়ের ওপরে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স করতে পারেন কোনো স্বামী? আমার মনে হয় না, সে ক্ষমতা কোনো স্বামীর থাকতে পারে বলে? "
"তাহলে কেন ডিভোর্স চান আপনি আপনার স্বামীর থেকে ? আপনার সাথে কোনো খারাপ কিছু না হলে তো আর শুধু শুধু একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন না আপনি ? "
বিচারকের এমন প্রশ্নে অনুপমা উত্তর দিতে শুরু করলো, "আজকের ভালোটুকু দেখেই আপনি বিচার করবেন ধর্মাবতার? আমার বিগত পঁচিশ বছরের প্রত্যেকটা দিনের কষ্ট, গ্লানি, চোখের জল, অমানসিক শারীরিক পরিশ্রম -- তার কি কোনো মূল্যই নেই ?


কলেজ জীবনে বন্ধুত্ব দিয়ে প্রেম আসে আমার জীবনে। দীর্ঘ সাত আট বছরের প্রেমের পরে আমাদের বিবাহিত জীবন শুরু হয়। বিয়ের পরেই দেখলাম, আমার স্বামীর মধ্যে থেকে সেই প্রেমিক হারিয়ে গেলো। সে তখন আমাকে তার মায়ের সাথে আপোষ করে চলার শিক্ষা দেয়, রান্না শিখে নিতে বলে, তার রোজকার জীবনের বহুকাজ আমার উপরে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে স্বামী হওয়ার মজা লুটতে শুরু করেন।

 স্বামীর মায়ের কাছে আমি তখন একজন তুচ্ছ প্রতিদ্বন্দ্বী মাত্র, যাকে রোজ অতি তুচ্ছ কারণে হেনস্থা, অপমান করে আমার শাশুড়িমা মজা লুটছেন মআমি কিন্তু তখনও চাকুরীরতাই ছিলাম, ছিলাম অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি সাবলম্বী। তবুও স্বামীকে কাছে পাবার লোভে শাশুড়িমায়ের দেওয়া সমস্ত গ্লানি হাসিমুখে মেনে নিয়েছি। লোভ ছিল একটাই, আমার স্বামীর মধ্যে যে প্রেমিক মানুষটি আছে সে তার প্রেম দিয়ে আমায় ভরিয়ে রাখবে। যতই অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হই না কেন, বাজারে তো আর প্রেম বিকোয় না, যে অর্থ দিয়ে কিনে নেবো। তাই নিজের উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে, তার সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে, তার মায়ের সামনে নিজেকে চরম ব্যর্থ হিসেবে প্রমাণ করে আমি সেই

 প্রেমিকের প্রেম পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি আমি সেই প্রেম।সেই প্রেমিক ভালোবাসার কবরে চাপা পড়ে গিয়ে একজন স্বামীকে ফিরিয়ে দিলো আমার কাছে, যে খুব ভালো সন্তান, যে খুব ভালো ভাই,
 আবার যে খুব ভালো বাবা, ভালো বন্ধু এমনকি ভালো বসও প্রমাণিত হলো।শুধু হতে পারলো না আমার প্রেমিক। ভালো প্রেমিক চাইনি,, প্রতিপত্তি থাকা, অর্থবান প্রেমিকও চাইনি। শুধু সামান্য একজন প্রেমিককে চেয়েছিলাম যার বিশাল হৃদয়টা শুধু আমার জন্য তোলা থাকবে, কিন্তু কিছুই হয়নি।

আমি সেই মানুষটার ভালোবাসার বাঁধনে পড়ে তার সন্তানের মা হলাম। সংসার, সন্তান, চাকরি -- সবকিছু সামলাতে গিয়ে যখন আমি নাজেহাল, যখন প্রতিদিন প্রতি ক্ষনে আমার শাশুড়িমায়ের গঞ্জনায় আমি অতিষ্ট, তখন আমার প্রেমিককে একটু পাশে চেয়েছিলাম, যে আমার পিঠের ব্যথায় তার হাতটা বুলিয়ে দেবে, যে অফিস শেষে তার ক্লান্ত শরীরটা নিয়েই আমার ক্লান্ত শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে বলবে, "চলো, আজ দুজনে মিলে কাজগুলো সেরে ফেলি। আমি মানা করলেও সে বলবে, "ক্লান্ত তো দুজনেই, অফিস তো দুজনেই করেছি, তাহলে ঘরের সবটুকু তুমি একা করবে কেন? "


আমি চেয়েছিলাম সেই প্রেমিককে যে তার মায়ের গঞ্জনার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, "এর চেয়ে বেশি কিছু আমার অনুপমা করতে পারবে না। তুমি ওকে অপমান করবে না। ভুলে যেওনা, অনুপমা শুধু আমার স্ত্রীই নয়, সে আমার ভালোবাসাও। "
সে বলেনি ধর্মাবতার, আমার হয়ে একটি কথাও খরচ করেনি সে | বরং বাচ্চা হওয়ার পরে যখন তখন আমার শরীরে, পেটে স্ট্রেচের দাগ, পেটটা মোটা, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে চোখের কোণে কালি পড়ে গেলো, তখন আমার সেই কুশ্রী চেহারাটাকে সে অবজ্ঞা করতে শুরু করে। তার কাছে সে সময় চেহারায় চড়া রঙ মাখা অফিস কলিগটির দুঃখ ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অফিসের পরেও বাড়ি ফিরে এসে তার সাথে চলতো ফোনে বার্তালাপ। আমি সব দেখেও চুপ ছিলাম। বহুবার আমার স্বামীর কাছে কাকুতি মিনতি করে বলেছি -- "আমি তোমার প্রেমিকা হতে চাই। কিন্তু আমার স্বামী তখন অন্য মহিলার মধ্যে প্রেমিকা খুঁজতে ব্যস্ত। আমি তবুও যাইনি আমার স্বামীকে ছেড়ে, বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম -- যদি আমার সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকটাকে ফিরে পাই কোনোদিন, এই আশায়।


মেয়েকে নিয়ে আমি তখনও আলাদা হতে পারতাম, কিন্তু হইনি। কারণ, আমি চাইনি, আমার সন্তান তার বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হোক। কিন্তু আমার স্বামী কি ভেবে দেখেছিলেন, তার প্রেম, তার ভালোবাসাকে যদি আমি তার মতোই অপমান করতাম, বেচে আসতাম অন্য কোনো পুরুষের কাছে, তাহলে তার কেমন লাগতো? সে ভাবেনি ধর্মাবতার, সে কোনোদিন আমার জায়গায় তাকে বসিয়ে ভাবেনি, আমার কষ্টটা কোথায়? বরং আমার কিঞ্চিৎ প্রতিবাদও তার পৌরুষকে নাড়িয়ে দিতো। আমার সিঁথিতে এক চিলতে করুণার সিঁদুর দিয়েছে বলে সে বহুবার অতি সহজে বলতে পেরেছে , "বৌ, বৌয়ের মতো থাকবে। "

হ্যাঁ, ধর্মাবতার , "বৌ".... বৌ হয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে আমায়, প্রেমিকা হতে পারিনি। একমাত্র মেয়ের যাবতীয় দায়িত্ব একা বয়ে চলেছি, নিঃশব্দে, যতই কষ্ট হোক না কেন আমার, মুখ ফুটে বলতে পারিনি। কারণ আমি জানতাম আমার সব অনুরোধের একটাই উত্তর আসবে -- "পারবো না।
আমার স্বামী আমাকে সেরা বৌয়ের শিরোপা দিয়েছেন তার বন্ধুমহলে। গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলেছেন -- "আমার বৌয়ের সাথে আমার কখন ঝগড়া হয় না। আমার বৌ ভীষণ এডজাস্টিভ। আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলায় না কখনো। "
কি করে নাক গলাবো বলুন তো? কি করে এডজাস্টিভ হবো না বলুন তো? তার ব্যক্তিগত জীবনটা তো তার একার ছিল। সে বিবাহিত হয়েও বিনা নোটিসে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়তো ভ্রমণের পথে, রাতের পর রাত আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিতেন নির্বিদ্বিধায়। কখনো জানতে চাননি, অনুপমার তাকে প্রয়োজন আছে কিনা ? তার ব্যক্তিগত জীবনটা যেমন একান্ত তার, আমার ব্যক্তিগত জীবনটাও কি আমার একান্ত ব্যক্তিগত নয়?
আমি দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে স্ত্রীর ভূমিকা পালন করেছি, তেইশ বছর ধরে মায়ের ভূমিকা পালন করেছি, যে সন্তানকে নিজে যেচে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলাম, তার প্রতি সমস্ত দায়িত্ব পালন করে তাকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছি, সাবলম্বী করে দিয়েছি। নিজের জীবনকে শূণ্য করে সবার জীবনকে পরিপূর্ণ করেছি।
কিন্তু বিনিময়ে আমি কি পেয়েছি -- কিচ্ছু না। বরং প্রতিক্ষনে আমার ভিতরের প্রেমিকাকে একটু একটু করে মরতে দেখেছি আমি , অবসাদে নিঃশব্দে তাকে কাঁদতে দেখেছি আমি। সেই প্রেমিকাকে আমি বাঁচাতে পারিনি ধর্মাবতার। কিন্তু আমার মধ্যে যে মানুষটা বেঁচে আছে এখনও, তাকে আমি পূর্ণরূপে বাঁচতে দিতে চাই, সেই মানুষটার জীবনে যত শূণ্য আছে, তাকে তৃপ্তি দিয়ে পূরণ করতে চাই তাই জীবন সায়হ্ন -- এ এসে আজ বন্ধন মুক্ত হতে চাই আমি, সংসারের সব মেকি সম্পর্ক থেকে। 

আমি জানি, আজ আমার স্বামী আমাকে ছাড়তে চাননা, কারণ, দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে আমার সেবা পেয়ে আমার সেবা পাওয়া তার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে, আমি আজ তার একটা অভ্যেস, একটা অবলম্বন, বলতে পারেন অন্ধের যষ্ঠীর মতো। কিন্তু অন্ধ হলেই যষ্ঠীর প্রয়োজন হয়, একটা লাঠির প্রয়োজন হয় ; একজন পঙ্গুর জীবনে তার লাঠিটা তার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তার ভালোবাসা হতে পারেনা কখনো আমার স্বামীর কাছেও আমি ঠিক তাই। আজ আমি তার একাকিত্ব জীবনে প্রয়োজন মাত্র , তার ভালোবাসা নই।

আমি এখন ইচ্ছেমতো ভোরের সূর্য্য দেখতে চাই, ইচ্ছেমতো পড়ন্ত দুপুর অব্দি বিছানার আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকতে চাই, ইচ্ছে মতো পাহাড় হতে চাই, ইচ্ছেমতো নদী। আমি সারারাত জেগে ডায়েরির বুকে মুখ লুকোতে চাই, লিখে রাখতে চাই মনের সব অভিব্যক্তি। পরেরদিন সকালবেলায় উঠে কাউকে চা জলখাবার করে দেবার তাড়া যেন আমাকে জোর করে ঘুমের কোলে না নিয়ে যেতে পারে, আমি সেই চেষ্টাটাই করতে চাই, আমি স্বাধীন হতে চাই।

খুব বেশি দাবী কি করেছি ধর্মাবতার? একটা মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে, আমৃত্যু শুধু দান করে যাবো, পাবো না কিছুই ? মনুষ্যজীবন তো পেয়েছি ঈশ্বরের কাছ থেকে , তাকে উপভোগ করার অধিকার তো কোনো পুরুষ বা কোনো সমাজ কেড়ে নিতে পারে না আমার কাছ থেকে ?
তাই, বাঁধনমুক্ত হয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো জীবনের শেষ কটা বছর নিজের মতো করে বাঁচতে চাই, জীবনের সব ব্যর্থতা আর শুন্যতাকে আনন্দ আর পরিতৃপ্তি দিয়ে পূরণ করতে চাই। তাই, জীবনের সব পিছুটান থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাই আমি। "
অনুপমার বক্তব্যে আদালতের এজলাস নিঃশব্দতায় ভরে গেলো। সত্যিই কি অনুপমা বেশি কিছু দাবী করেছে ? সত্যিই কি এই দাবী অনুপমার শুধু একার ? এই দাবী কি পৃথিবীর সব অনুপমার নয় ? পৃথিবীর সব অনুপমাই কি স্বামীর মধ্যে একজন প্রেমিককে খুঁজতে খুঁজতে ফুরিয়ে যায় না ?
উত্তর জানা নেই কারোরই। বিচারকও স্তব্ধ। জীবনের আদালতে বিচার করা যে শুধু কঠিনই নয়, সে বিচার যে বড়ো বেদনাদায়কও ।
------------------------------------------------------------
সমাপ্ত
#গল্প
#শূণ্য_পূরণ
#কলমে_অনন্যা_পোদ্দার

 আরও পড়ুনঃ 

শেষ চিঠি – হৃদয়স্পর্শী মানবিক বাংলা গল্প | আবেগঘন অনুপ্রেরণামূলক গল্প 

বাবার শেষ উপহার | হৃদয়স্পর্শী মানবিক বাংলা গল্প | জীবন বদলে দেওয়া গল্প 

এক মুঠো ভাত – হৃদয়স্পর্শী মানবিক বাংলা গল্প | অনুপ্রেরণামূলক গল্প 

Men's Wellness and Reproductive Health: A Complete Guide to Healthy Living

White Vaginal Discharge in Women: Causes, Symptoms, Treatment & Prevention

 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url