এক মুঠো ভাত – হৃদয়স্পর্শী মানবিক বাংলা গল্প | অনুপ্রেরণামূলক গল্প
এক মুঠো ভাত
![]() |
শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় মানুষের ভিড়। সবাই যার যার কাজে ছুটছে। সেই ভিড়ের মাঝেই দশ বছরের রাকিব ফুল বিক্রি করছিল। স্কুলে যাওয়ার বয়স হলেও সংসারের অভাব তাকে বইয়ের বদলে ফুলের ঝুড়ি হাতে তুলে দিয়েছে।
সেদিন সকাল থেকে একটি ফুলও বিক্রি হয়নি। ক্ষুধায় তার পেট জ্বলছিল। পকেটে ছিল মাত্র দশ টাকা, যা দিয়ে নিজের জন্য কিছু কিনলে রাতে অসুস্থ মায়ের জন্য ওষুধ কেনা সম্ভব হবে না।
রাকিব ক্ষুধা চেপে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
রাস্তার মোড়ে পৌঁছে সে দেখল, এক বৃদ্ধা ডাস্টবিনের পাশে বসে কাঁপছেন। তাঁর সামনে একটি খালি বাটি। চোখেমুখে ক্লান্তি আর অনাহারের ছাপ।
রাকিব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের পকেট থেকে শেষ দশ টাকার নোটটি বের করল। কাছের হোটেলে গিয়ে এক প্লেট ভাত আর ডাল কিনে বৃদ্ধার সামনে এনে রাখল।
বৃদ্ধা অবাক হয়ে বললেন,
— "বাবা, তুমি কি খেয়েছ?"
রাকিব মুচকি হেসে বলল,
— "আমি পরে খাব। আপনি আগে খান।"
বৃদ্ধার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি শুধু বললেন,
— "আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন।"
রাকিব তখনও ক্ষুধার্ত। কিন্তু তার মনে অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল।
সেই দৃশ্যটি দূর থেকে দেখছিলেন একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। তিনি কাছে এসে রাকিবকে জিজ্ঞেস করলেন,
— "তুমি নিজের খাবারটা অন্যকে দিলে কেন?"
রাকিব শান্তভাবে উত্তর দিল,
— "আমার ক্ষুধা আজকের। কিন্তু দাদির ক্ষুধাটা মনে হলো আরও বড়।"
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— "তুমি কি পড়াশোনা করো?"
রাকিব মাথা নিচু করে বলল,
— "আগে করতাম। এখন আর পারি না।"
ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন। তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক।
পরদিন তিনি রাকিবের বাড়িতে গেলেন। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন, রাকিবকে আবার স্কুলে ভর্তি করালেন এবং সংসারের জন্য মাসিক সহায়তার ব্যবস্থা করলেন।
বিদায় নেওয়ার সময় তিনি বললেন,
— "আজ আমি তোমাকে সাহায্য করছি না। আমি তোমার কাছ থেকে মানবিকতার শিক্ষা নিচ্ছি।"
বছর কেটে গেল।
রাকিব পড়াশোনা শেষ করে একজন চিকিৎসক হলো। কিন্তু নিজের অতীত ভুলল না।
প্রতি শুক্রবার সে শহরের পথশিশু ও অসহায় মানুষদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসা করত। চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করত।
একদিন চিকিৎসা শিবিরে সে একটি পরিচিত মুখ দেখল।
সেই বৃদ্ধা।
বৃদ্ধা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
— "বাবা, তুমি কি সেই ছোট্ট ছেলেটা, যে একদিন আমাকে এক মুঠো ভাত খাইয়েছিল?"
রাকিব হাসিমুখে তাঁর হাত ধরল।
— "হ্যাঁ দাদি, সেদিন আমি আপনাকে ভাত দিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি আমাকে শিখিয়েছিলেন—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার দয়া।"
বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।
তিনি বললেন,
— "আমি সেদিন ভাত খাইনি শুধু, মানুষের প্রতি বিশ্বাসও ফিরে পেয়েছিলাম।"
রাকিব আকাশের দিকে তাকাল। মনে হলো, ছোট্ট একটি ভালো কাজ কখন যে কত দূর পর্যন্ত আলো ছড়ায়, তা কেউ জানে না।
সেদিনের সেই এক প্লেট ভাত শুধু একজন ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরায়নি; বদলে দিয়েছিল দুটি জীবন, আর তাদের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ।
শিক্ষা:
যে মানুষ নিজের অভাবের মধ্যেও অন্যের অভাব অনুভব করতে পারে, প্রকৃত ধনী সে-ই। মানবিকতার মূল্য কখনো টাকায় মাপা যায় না।
=================================
#পাত্রী_দেখা
হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ
বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিনের মতোই মানুষের ভিড়। কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ বাড়ি ফিরছে, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে ছুটে চলেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সত্তর বছরের বৃদ্ধ আবদুল কাদের। তাঁর হাতে ছিল একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ, যার ভেতরে ছিল কিছু ওষুধ আর বাজারের সামান্য জিনিস।
হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, একটি কালো রঙের মানিব্যাগ মাটিতে পড়ে আছে। আশপাশে কেউ খেয়াল করেনি। তিনি মানিব্যাগটি তুলে খুলে দেখলেন। ভেতরে বেশ কিছু টাকা, কয়েকটি ব্যাংক কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি ছোট্ট শিশুর ছবি।
পাশে দাঁড়ানো একজন বলল,
— "চাচা, এত টাকা! কেউ জানে না। রেখে দিন, আপনারই কাজে লাগবে।"
আবদুল কাদের শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
— "যে টাকা আমার নয়, তা কখনো আমার হতে পারে না।"
তিনি মানিব্যাগের পরিচয়পত্র দেখে মালিকের নাম জানলেন—সায়েম রহমান। কিন্তু ফোন নম্বর ছিল না।
তিনি বাড়ি ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু গেলেন না। বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে এক যুবক দৌড়াতে দৌড়াতে এসে সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লাগল,
— "কেউ কি একটা কালো মানিব্যাগ দেখেছেন?"
আবদুল কাদের উঠে দাঁড়ালেন।
— "তোমার নাম কি সায়েম রহমান?"
যুবক অবাক হয়ে বলল,
— "জি! আপনি কীভাবে জানলেন?"
বৃদ্ধ মানিব্যাগটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন।
সায়েম কাঁপা হাতে মানিব্যাগ খুলে দেখল—একটি টাকাও কমেনি।
সে আবেগে বলল,
— "চাচা, আপনি আমার অনেক বড় উপকার করলেন। এই টাকাগুলো আমার মায়ের অপারেশনের জন্য তুলেছিলাম। যদি হারিয়ে যেত, অপারেশনটা আর হতো না।"
সে কিছু টাকা বৃদ্ধের হাতে দিতে চাইল।
আবদুল কাদের মৃদু হেসে বললেন,
— "উপকারের দাম টাকা দিয়ে হয় না। যদি কোনো দিন সুযোগ পাও, অন্য কারও বিপদে পাশে দাঁড়াবে। সেটাই হবে আমার প্রাপ্য।"
সায়েম মাথা নত করে তাঁর হাত চুমু খেল।
কয়েক মাস পরে একদিন আবদুল কাদের অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। তাঁর চিকিৎসার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য পরিবারের ছিল না।
ঠিক তখনই হাসপাতালে এসে হাজির হলো একজন তরুণ ডাক্তার।
তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
— "চাচা, আমাকে চিনতে পারছেন?"
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
— "না বাবা।"
ডাক্তার হেসে বললেন,
— "আমি সেই সায়েম। যেদিন আপনি আমার মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম—আপনার মতো একজন সৎ মানুষের ঋণ কখনো ভুলব না। আজ আপনার সব চিকিৎসার দায়িত্ব আমার।"
আবদুল কাদেরের চোখ ভিজে উঠল।
তিনি ধীরে বললেন,
— "আমি তো শুধু আমার কর্তব্যটাই করেছিলাম।"
ডাক্তার উত্তর দিলেন,
— "সত্যিকারের কর্তব্যই একদিন মানুষের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে ফিরে আসে।"
হাসপাতালের জানালা দিয়ে তখন সকালের সূর্যের আলো ভেতরে ঢুকছিল। আবদুল কাদের মনে মনে ভাবলেন, পৃথিবী এখনো সুন্দর। কারণ পৃথিবীতে এখনো এমন মানুষ আছে, যারা ভালোবাসা, সততা আর মানবিকতাকে টাকার চেয়ে বড় মনে করে।
শিক্ষা:
সততা কখনো ক্ষতি নয়। ভালো কাজের প্রতিদান সব সময় একই মানুষের কাছ থেকে না এলেও, জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে তা অবশ্যই ফিরে আসে।
===============
আরও গল্প পড়ুনঃ
এক মুঠো ভাত – হৃদয়স্পর্শী মানবিক বাংলা গল্প | অনুপ্রেরণামূলক গল্প
শেষ আশ্রয় – একটি হৃদয়স্পর্শী মানবিক গল্প | বাংলা অনুপ্রেরণামূলক গল্প
শেষ চিঠি | আবেগঘন বাংলা গল্প | মা ও সন্তানের ভালোবাসা | shesh chithi bangla emotional story


