অচেনা স্টেশনের শেষ ট্রেন | রহস্যময় বাংলা গল্প | কণে দেখা | বিছানার উপর মেয়েদের | Bichanar Upor Meyeder
গল্পের নাম: অচেনা স্টেশনের শেষ ট্রেন
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু মেঘ আর হালকা কুয়াশা। ছোট্ট শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা "রূপনগর রেলস্টেশন" যেন দিনের কোলাহল ভুলে গভীর নীরবতায় ডুবে আছে।
প্ল্যাটফর্মে মাত্র কয়েকজন মানুষ। কেউ বেঞ্চে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেউ চা খাচ্ছে। স্টেশনের পুরোনো লাউডস্পিকারে ভাঙা কণ্ঠে ঘোষণা ভেসে এলো—
"শেষ ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম নম্বর একে প্রবেশ করবে।"
অর্ণব বেঞ্চে বসে ছিল। বয়স আটাশ। শহরের একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করত। কিন্তু আজ তার হাতে চাকরি নেই। কোম্পানি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিনেই সব বদলে গেছে।
বাড়িতে বৃদ্ধ মা। ছোট বোনের পড়াশোনা। ব্যাংকের ঋণ। মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা একসঙ্গে ঘুরছে।
সে ঠিক করেছিল, কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে যাবে। অন্তত মায়ের কাছে থাকলে মনটা কিছুটা শান্ত হবে।
ট্রেন আসতে এখনো দশ মিনিট বাকি।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বসে থাকা একজন বৃদ্ধকে।
সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর দাড়ি, হাতে একটি পুরোনো চামড়ার ব্যাগ।
বৃদ্ধ মানুষটি যেন কারও অপেক্ষা করছেন।
অর্ণব অজান্তেই এগিয়ে গেল।
—চাচা, কোথায় যাবেন?
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—যেখানে এই শেষ ট্রেন আমাকে নিয়ে যাবে।
উত্তরটা অদ্ভুত লাগল।
—টিকিট কেটেছেন?
—হ্যাঁ।
—কোথাকার?
বৃদ্ধ টিকিটটা বাড়িয়ে দিলেন।
অর্ণব অবাক হয়ে দেখল, টিকিটে কোনো গন্তব্যের নাম নেই।
শুধু লেখা—
"শেষ স্টেশন"
সে ভুরু কুঁচকে বলল,
—এমন টিকিট তো কখনো দেখিনি।
বৃদ্ধ শুধু হেসে বললেন,
—সব টিকিট সবাই দেখতে পায় না।
অর্ণব আর কিছু বলতে পারল না।
ঠিক তখনই ট্রেন এসে থামল।
ট্রেনে আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম যাত্রী।
অর্ণব আর বৃদ্ধ একই কামরায় উঠলেন।
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর অর্ণব লক্ষ্য করল, পুরো কামরায় তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
জানালার বাইরে কুয়াশা ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ বৃদ্ধ বললেন,
—তুমি খুব চিন্তায় আছো।
অর্ণব হেসে বলল,
—বুঝলেন কীভাবে?
—চোখ দেখে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর অর্ণব নিজের জীবনের সব কথা খুলে বলল।
চাকরি হারানোর কষ্ট।
বাবাকে ছোটবেলায় হারানোর স্মৃতি।
মায়ের দায়িত্ব।
নিজের ব্যর্থতার অনুভূতি।
সব।
বৃদ্ধ মন দিয়ে শুনলেন।
তারপর বললেন,
—জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাতই অনেক সময় নতুন ভোরের শুরু হয়।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—বইয়ের কথা শুনতে ভালো লাগে। বাস্তব জীবন এত সহজ নয়।
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
—ঠিক বলেছ। কিন্তু বাস্তব জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, মানুষ ভাবে তার গল্প এখানেই শেষ।
ট্রেন তখন একটি অচেনা স্টেশনে এসে থামল।
স্টেশনের নামফলকে লেখা—
"আশা"
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
—এই নামে কোনো স্টেশন তো নেই!
বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
—সব মানচিত্রে সব স্টেশনের নাম লেখা থাকে না।
ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
কিছু দূর যাওয়ার পর দ্বিতীয় স্টেশন।
নাম—
"স্মৃতি"
এবার অর্ণবের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল।
তার মনে পড়ে গেল বাবার সঙ্গে ছোটবেলায় ট্রেনে ভ্রমণের কথা।
হঠাৎ মনে হলো, যেন বাবার হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
সে দ্রুত জানালার বাইরে তাকাল।
কেউ নেই।
শুধু কুয়াশা।
—আপনি কে?
বৃদ্ধ এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
—আমি একজন যাত্রী।
—কিন্তু এই স্টেশনগুলো...
—সব মানুষ এগুলো দেখতে পায় না।
অর্ণবের মনে অদ্ভুত ভয় কাজ করতে লাগল।
সে উঠে অন্য কামরায় যেতে চাইল।
কিন্তু দরজা খুলল না।
সব দরজা যেন ভেতর থেকে বন্ধ।
বৃদ্ধ শান্ত গলায় বললেন,
—ভয় পেও না।
শেষ ট্রেনে ভয় নিয়ে উঠলে পথটা অনেক দীর্ঘ মনে হয়।
ট্রেনের গতি হঠাৎ কমে গেল।
তৃতীয় স্টেশনের নাম—
"অনুশোচনা"
প্ল্যাটফর্মে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
তারা সবাই মাথা নিচু করে আছে।
কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না।
অর্ণব দেখল, তাদের মধ্যে একজন অবিকল তার মতো দেখতে।
সে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,
—ওটা... ওটা তো আমি!
বৃদ্ধ বললেন,
—ও তুমি নও।
ও সেই মানুষ, যে সারাজীবন শুধু আফসোস করে।
যে কখনো নতুন শুরু করার সাহস পায় না।
ট্রেন আবার ছেড়ে দিল।
অর্ণবের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
এবার সে বুঝতে পারছিল না, সে কি স্বপ্ন দেখছে, নাকি সত্যিই এমন কিছু ঘটছে।
কিছুক্ষণ পর ট্রেন একটি দীর্ঘ সেতুর ওপর দিয়ে যেতে লাগল।
নিচে শুধু অন্ধকার।
হঠাৎ পুরো ট্রেনের আলো নিভে গেল।
চারদিকে ঘন অন্ধকার।
কয়েক সেকেন্ড পর আলো জ্বলতেই অর্ণব দেখল...
বৃদ্ধ মানুষটি আর তার সামনের সিটে নেই।
কিন্তু তাঁর পুরোনো চামড়ার ব্যাগটি ঠিকই পড়ে আছে।
কাঁপা হাতে ব্যাগটি খুলতেই ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি পেল।
প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা—
"যে এই ডায়েরি পড়বে, সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে।"
অর্ণবের হাত কাঁপতে শুরু করল।
সে ধীরে ধীরে দ্বিতীয় পাতাটি খুলল।
আর সেখানে যা লেখা ছিল, তা পড়ে তার নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল...
পাতার ওপরে স্পষ্ট করে লেখা—
"আগামীকাল সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটবে, যা তোমার পুরো ভাগ্য বদলে দেবে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে..."
অর্ণব বিস্ময়ে জমে গেল।
ঠিক তখনই ট্রেনের লাউডস্পিকারে ভেসে এল—
"পরবর্তী স্টেশন... শেষ স্টেশন..."
গল্পের নাম: অচেনা স্টেশনের শেষ ট্রেন (পার্ট–২)
ট্রেনের লাউডস্পিকারে আবারও ভেসে এল—
"পরবর্তী স্টেশন... শেষ স্টেশন..."
অর্ণবের বুকের ভেতর ধড়ফড় শব্দ যেন আরও বেড়ে গেল। তার হাতে ধরা পুরোনো ডায়েরির পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছে। সে আবার লেখাটি পড়ল—
"আগামীকাল সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে তোমার জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটবে, যা তোমার পুরো ভাগ্য বদলে দেবে। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
সে দ্রুত পরের পাতা খুলল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
"ভয় মানুষকে পথ হারায়, আর সাহস তাকে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।"
অর্ণব চারদিকে তাকাল।
বৃদ্ধ মানুষটি কোথাও নেই।
মনে হলো, যেন তিনি কোনোদিন এই কামরায় ছিলেনই না।
ঠিক তখনই ট্রেন ধীরে ধীরে থামল।
জানালার বাইরে বড় একটি সাইনবোর্ড।
তাতে লেখা—
"শেষ স্টেশন"
অর্ণব দরজা খুলে প্ল্যাটফর্মে নামল।
অদ্ভুত ব্যাপার!
পুরো স্টেশন ফাঁকা।
কোনো যাত্রী নেই, কোনো দোকান নেই, এমনকি স্টেশন মাস্টারও নেই।
শুধু প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে একটি পুরোনো ঘড়ি।
ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে—
রাত ১২টা।
সে কয়েক কদম এগোতেই দেখতে পেল, একটি কাঠের বেঞ্চে সেই বৃদ্ধ বসে আছেন।
মুখে আগের মতোই শান্ত হাসি।
অর্ণব ছুটে গিয়ে বলল,
—আপনি এখানে! আপনি কে? আমাকে এখানে কেন এনেছেন?
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
—এই প্রশ্নের উত্তর তো তোমার নিজের কাছেই আছে।
—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!
বৃদ্ধ বললেন,
—মানুষ যখন জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলে, তখন সে নিজের ভেতরের স্টেশনগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। আশা, স্মৃতি, অনুশোচনা—সবই তোমার নিজের মন।
অর্ণব স্তব্ধ হয়ে গেল।
বৃদ্ধ আবার বললেন,
—আজ তুমি নিজের ভয়কে দেখেছ। এখন সিদ্ধান্ত তোমার।
ভয় নিয়ে বাঁচবে, নাকি নতুন করে শুরু করবে?
অর্ণব কিছু বলার আগেই চারদিকে ঘন কুয়াশা নেমে এল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল।
হঠাৎ সে অনুভব করল কেউ তাকে ডাকছে।
—ভাই! উঠবেন?
চোখ খুলে দেখল, সে ট্রেনের সিটেই বসে আছে।
একজন টিকিট পরীক্ষক তার সামনে দাঁড়িয়ে।
—শেষ স্টেশন এসে গেছে।
অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল।
এটি সম্পূর্ণ পরিচিত একটি স্টেশন।
কোনো রহস্য নেই।
কোনো অদ্ভুত সাইনবোর্ড নেই।
বৃদ্ধও নেই।
সে দ্রুত চারদিকে খুঁজল।
কিন্তু বৃদ্ধের কোনো চিহ্ন নেই।
শুধু পাশের সিটে পড়ে আছে সেই পুরোনো ডায়েরি।
অর্ণব বিস্মিত হয়ে সেটি ব্যাগে রেখে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
পরদিন সকাল।
ঘড়িতে ঠিক ৮টা ১০ মিনিট।
অর্ণব বারান্দায় বসে ডায়েরির কথাগুলো ভাবছিল।
সে নিজেই নিজেকে বলল,
"সবই হয়তো স্বপ্ন ছিল।"
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
একটি অচেনা নম্বর।
—হ্যালো, আমি "টেকনোভা সলিউশনস" থেকে বলছি।
আপনি ছয় মাস আগে আমাদের কাছে একটি আবেদন করেছিলেন।
আমাদের নির্বাচিত প্রার্থী ব্যক্তিগত কারণে যোগ দিচ্ছেন না।
আপনি কি আজ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে অনলাইন সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারবেন?
অর্ণব ঘড়ির দিকে তাকাল।
৮টা ১৪।
ডায়েরির কথাগুলো হুবহু সত্যি!
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মা হঠাৎ রান্নাঘরে অসুস্থ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।
অর্ণব দৌড়ে গেল।
একদিকে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ।
অন্যদিকে অসুস্থ মা।
ডায়েরিতে লেখা ছিল—
"কঠিন সিদ্ধান্ত।"
এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ল্যাপটপ বন্ধ করে মাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
তার মনে হচ্ছিল, চাকরির সুযোগটি হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না।
হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক বললেন,
—আর একটু দেরি হলে রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারত।
অর্ণব মায়ের হাত ধরে চুপচাপ বসে রইল।
তার মনে কোনো আফসোস ছিল না।
কারণ সে জানত, সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঠিক তখনই আবার ফোন এল।
ওপাশ থেকে সেই একই কণ্ঠ।
—মিস্টার অর্ণব, আমরা জানতে পেরেছি আপনি সাক্ষাৎকারে যোগ দিতে পারেননি কারণ আপনি আপনার মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
আমরা আপনার দায়িত্ববোধে মুগ্ধ হয়েছি।
আপনি চাইলে আজ বিকেলেই নতুন সময়ে সাক্ষাৎকার দিতে পারেন।
অর্ণব অবাক হয়ে গেল।
বিকেলের সাক্ষাৎকারটি ছিল অসাধারণ।
তার অভিজ্ঞতা, সততা আর আত্মবিশ্বাস দেখে কর্তৃপক্ষ সেদিনই তাকে নিয়োগপত্র দিয়ে দিল।
আগের চাকরির চেয়েও ভালো বেতন।
ভালো সুযোগ।
ভালো ভবিষ্যৎ।
কয়েক মাস পরে অর্ণবের জীবন পুরোপুরি বদলে গেল।
মায়ের চিকিৎসা সম্পূর্ণ হলো।
বোনের পড়াশোনার খরচ নিয়ে আর চিন্তা করতে হলো না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে আবার রূপনগর স্টেশনে গেল।
সবকিছু আগের মতোই।
কিন্তু সেই রহস্যময় বৃদ্ধ কোথাও নেই।
স্টেশন মাস্টারকে সে জিজ্ঞেস করল,
—কয়েক মাস আগে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধকে এখানে দেখেছিলেন?
স্টেশন মাস্টার কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—এই বর্ণনার একজন মানুষকে চিনতাম।
তিনি ছিলেন এই স্টেশনের সাবেক স্টেশন মাস্টার।
খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
তবে...
তিনি তো পাঁচ বছর আগেই মারা গেছেন।
অর্ণবের শরীর শিউরে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে সেই ডায়েরিটি বের করল।
শেষ পাতাটি এতদিন সে খোলেনি।
আজ খুলল।
সেখানে লেখা—
"জীবনের শেষ ট্রেন কখন আসবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু প্রতিদিন এমনভাবে বাঁচো, যেন কোনো অনুশোচনা সঙ্গে না থাকে।"
পাতার নিচে একটি ছোট্ট স্বাক্ষর—
"একজন পথপ্রদর্শক।"
অর্ণব ডায়েরিটি বন্ধ করল।
স্টেশনের বেঞ্চে কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।
ঠিক তখনই একটি ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।
সে মৃদু হেসে বলল,
"শেষ ট্রেন আসলে কোনো ট্রেন নয়। এটা জীবনের সেই মুহূর্ত, যখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই—ভয়ে থেমে থাকব, নাকি সাহস নিয়ে সামনে এগোব।"
সেদিনের পর থেকে অর্ণব জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে একটি কথাই মনে রাখত—
"অন্ধকার পথের শেষেই আলো অপেক্ষা করে। শুধু হাঁটা থামানো যাবে না।"
—সমাপ্ত—
Excerpt (সংক্ষিপ্ত সারাংশ):
একটি রহস্যময় ট্রেনযাত্রা, অচেনা এক বৃদ্ধ, আর এমন একটি ডায়েরি যা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। অর্ণবের জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত কীভাবে তার ভাগ্য বদলে দেয়, সেই গল্পই "অচেনা স্টেশনের শেষ ট্রেন"।
======
গল্পের নামঃ কণে দেখা
বিছানার উপর মেয়েদের বায়োডাটা ছুঁড়ে মা'রলেন মিসেস ইলোরা। দাম্ভিক স্বরে বললেন," এখানে যতগুলো মেয়ে আছে সবাই আমার ছেলের যোগ্য পাত্রী ছিল। সুন্দরী, শিক্ষিতা আর উচ্চবিত্ত পরিবার। ওদের নখের সমান হওয়ার ক্ষমতাও তোমার নেই।
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্যি। অস্বীকার করতে পারবে তুমি?" অরিনের চোখ থেকে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। মিসেস ইলোরা অরিনের শাশুড়ী হোন। কিছুদিন পর পরই তিনি অরিনকে অপমান করার নান্দনিক উপায় খুঁজে বের করেন। আজ বের করেছেন মেয়েদের বায়োডাটা। অরিনের সাথে ইলহানের বিয়ের আগে ঠিক এতোগুলো মেয়ের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল ইলহানের জন্য। হ্যাঁ, অরিন স্বীকার করে যে এই মেয়েগুলোর তুলনায় সে কিছুই না। তার না আছে রূপ,
না আছে অসাধারণ কোনো গুণ। আর না আছে উচ্চবিত্ত পরিবার! সে অতি সামান্য একটি মেয়ে। কিন্তু এই সামান্য মেয়েটিকেই অসামান্য ভালোবাসা দেখিয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছিল ইলহান। একমাত্র ছেলের বউ হিসেবে এমন রুগ্ন,কালো, দরিদ্র ঘরের মেয়েকে কিছুতেই মানতে পারছেন না ইলোরা। কথায় কথায় অরিনকে তিনি মনে করিয়ে দিতে চান যে অরিন অযোগ্য! মিসেস ইলোরা বললেন," চুপ করে আছো কেন? কাগজগুলো হাতে নাও। নেড়েচেড়ে দেখো কত ক্লাসি মেয়েদের ছবি আছে এখানে। সবাইকে রিজেক্ট করে ইলহান তোমাকে বেছে নিয়েছে। কেন জানো? কারণ আমার ছেলে অকৃতজ্ঞ নয়। যে একবার ওর উপকার করে, সেটা ও জীবনভর মনে রাখে। তুমি ওর একটা বড় ভুল শুধরে দিয়েছিলে তাই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ও তোমাকে বিয়ে করেছে।" অরিন শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল," কিন্তু আমি তো উনাকে কখনও বলিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমাকে বিয়ে করতে হবে। আমি কারো উপকার করলে দায়িত্ববোধ থেকে করি। বিনিময় পাওয়ার আশায় করি না।" "
তাই বুঝি? শুধু মুখেই বড় বড় কথা। না চাইতেও যখন কেউ কিছু পেয়ে যায় তখন সেই জিনিসের মূল্য দিতে পারে না। তুমিও নিজের যোগ্যতার বাইরে অনেক বড় কিছু পেয়ে গেছো৷ তাই ঠিকঠাক কদর করতে পারছো না।" " মা, আপনার কেন মনে হয় যে আমি ইলহানের যথাযথ কদর করতে পারছি না?" অরিনের প্রশ্নে মিসেস ইলোরার চেহারা শক্ত হলো। ঠোঁটে অবজ্ঞার হাসি মিশিয়ে বললেন," নির্লজ্জের মতো প্রশ্ন করছো? তুমি জানো না কেন? নাকি ভাবছো আমি তোমার ব্যাপারে কিছুই খোঁজ-খবর রাখি না? দিনের পর দিন আমার ছেলেটাকে ঠকিয়ে যাচ্ছো তুমি। অথচ ও তোমাকে বিয়ে করে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপকার করেছে। সেই উপকারের প্রতিদান তুমি দিচ্ছো প্রতারণা দিয়ে। ছিঃ! লজ্জা লাগা উচিৎ। " অরিন নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শাশুড়ীমায়ের এহেন কথা মোটেও বোধগম্য হলো না। সে ঠকাবে ইলহানকে? এমন সর্বনাশের কথা চিন্তাও করতে পারে না কখনও।
মিসেস ইলোরা সরু দৃষ্টিতে বললেন," অভিনয়ে তুমি মারাত্মক। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই বুঝতে পারছো না। কথাগুলো আমি ইলহানের সামনেই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম ওর সামনেও তুমি এমন নাটক করবে। তাই আলাদা ডেকে এনেছি। প্রমাণ তো আমি আজ নয় কাল যোগাড় করবোই। এখন থেকে তোমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপে আমার নজর থাকবে।" অরিন কাতর গলায় বলল," মা, আপনি নিশ্চয়ই ভুল শুনেছেন। আমাকে ক্লিয়ার করে বলুন। নাহলে আমি বুঝতে পারছি না।" " এখন আমি তোমাকে কিছুই বলবো না অরিন। আগে-ভাগে তোমাকে বলে দেই আর তুমিও সতর্ক হয়ে যাও এতো বোকা আমি না। তোমাকে হাতেনাতে ধরা হবে। আর তখন দেখবো কিভাবে নিজেকে বাঁচাও তুমি।" অরিন আশ্চর্য হয়ে গেল। ভদ্রমহিলা কি চাইছেন তার থেকে? মনে হচ্ছে অরিনের সংসারটা না ভাঙা পর্যন্ত উনি ক্ষান্ত হবেন না। অরিনের ক্রোধে কেঁদে ফেলতে মন চাইল। ইলোরা ঝাঁঝালো গলায় বলল," দাঁড়িয়ে না থেকে আমার চোখের সামনে থেকে যাও। আমার কথা শেষ। " বায়োডাটার কাগজগুলো আলমারিতে তুলে রাখছেন ইলোরা। অরিন নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো। পুরো ব্যাপারটাই ষড়যন্ত্র মনে হচ্ছে। একটি গভীর ও জঘন্য ষড়যন্ত্র। অরিন জানে না ভাগ্যে কি আছে! তবে এইটুকু সে জানে, তার ভাগ্যে কখনোই সুখ স্থায়ী হয় না। " অরিন, একটু আমার রুমে এসোতো। ট্রাউজারটা খুঁজে পাচ্ছি না।" ইলহানের ডাক শুনে অরিন ধীরপায়ে বেডরুমের দিকে গেল। কিন্তু ট্রাউজার খুঁজে না পেলে অরিনকে ডাকার কি আছে? অরিন তো ইলহানের ড্রয়ার গোছায় না। ইলহান নিজেই গুছিয়ে রাখে। তবে মাঝে মাঝে কাজের মেয়ে জরী ছাদ থেকে শুকনো কাপড় এনে ভাজ করে ইলহানের ড্রয়ারে রাখে। অরিন রুমে প্রবেশ করতে করতে বলল," আমি কিভাবে জানবো তোমার ট্রাউজার কই? জরীকে ডাকলেই তো হতো।" ইলহান ভ্রু কুচকে বলল," জরী আমার বেডরুমে এসে ট্রাউজার খুঁজে দিবে নাকি? তোমার কি মাথাখারাপ হয়ে গেছে?" অরিন কিছু বলল না।
সে বিছানায় বসার সাথে সাথেই ইলহান দরজা আটকালো। অরিন এইবার বুঝল ট্রাউজার খোঁজা আসলে একটি বাহানা মাত্র। ইলহান তাকে রুমে ডেকেছে অন্য মতলবে। অরিন একদৌড়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। তার চালাকি দেখে ইলহান হতভম্ব। দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলল," অরিন এটা কিন্তু চিটিং। দরজা খোলো বলছি।" " উহুম। চিটিং তো তুমি করেছো। মিথ্যে বলে আমাকে রুমে এনেছো। বদের হাড্ডি!" " তাহলে আমার কি করা উচিৎ ছিল? মা-বাবা, বোন সবাইকে শুনিয়ে যদি বলতাম অরিন আমার রুমে এসো, তোমাকে চু'মু দিতে ইচ্ছে করছে। তাহলে ভালো হতো?" অরিন দু'হাতে কান চেপে ধরল," ছি, দিন দিন খুব নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছো তুমি।" " যদি এখনি বের না হও তাহলে কিন্তু এর চেয়েও বেশি নির্লজ্জ হবো।" " শর্ত আছে।" " আবার কি শর্ত?" " আজকে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে ছাদে গিয়ে আমরা বৃষ্টিতে ভিজবো।" " অসম্ভব। কোনো মানেই হয় না। পরে যদি জ্বর-টর আসে?" "
এখন বৃষ্টিতে ভিজলেই জ্বর আসে তাই না? অথচ বিয়ের আগে কত বড় বড় কথা। তোমার সাথে সারাজীবন সুখবর্ষণ দেখতে চাই। অরিন, তুমি তো আমার সুখবৃষ্টি। চিরকাল বৃষ্টিতে ভেজার সঙ্গিনী হবে? আর এখন বৃষ্টিতে ভিজতে বললেই বাহানা তাই না?" ইলহান হাঁফ ছেড়ে বলল," ওকে, ভিজবো। এবার অন্তত বের হও।" অরিন দরজা খুলে বের হতে বোধ হয় একটু দেরি করল। কিন্তু ইলহান তার নরম শরীর শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে এক মুহূর্তও দেরি করল না। অরিন হাঁসফাঁস করে বলল," ছাড়ো, দম আটকে মে'রে ফেলবে নাকি?" ইলহান ছাড়ল না। গভীর স্পর্শে চু'মু দিল গালে, নাকে, কপালে, ঠোঁটে আর গলায়। রাতে সত্যিই খুব জোরালো বর্ষণ হলো। টিনের চাল হলে ঝমঝম আওয়াজটা মজা করে শোনা যেতো। অরিনদের আগের বাড়িতে টিনের ছাদ ছিল। বৃষ্টি এলেই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তো অরিন। চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির গান শুনতো। দারুণ চমৎকার একটি ব্যাপার ছিল। অরিনের ইচ্ছে করছে ছাদে যেতে।
কিন্তু একা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে না। ইলহান ঘুমিয়ে পড়েছে। তার সুন্দর ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে ডাকতে মায়া লাগছে। অরিনের মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়৷ তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা রাজপুত্রের মতো দেখতে অদ্ভুত সুদর্শন মানুষটিই কি তার স্বামী? অরিন কখনও কল্পনা করেনি যে এমন চমৎকার একজন মানুষের সাথে তার বিয়ে হবে। সেদিনও এমন বৃষ্টির রাত ছিল। অরিন মনের সমস্ত অভিমান জমা করে, নিজেকে পাথর বানিয়ে একটি অমানুষের সাথে বিয়ের পিরিতে বসতে যাচ্ছিল। তখনি এক পশলা সুখের বৃষ্টির মতো আবির্ভাব ঘটল ইলহানের। তার ছোটবোন ইলমি অরিনের বেস্টফ্রেন্ড।
সে বিয়েবাড়িতে ঢুকে অরিনকে বাহিরে আসার অনুরোধ করল। অরিনের মা হালিমাও কেন যেন রাজি হলেন। হয়তো ইলমিকে তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন, সেজন্যই। অরিন যখন ইলমির হাত ধরে বাহিরে বের হচ্ছিল তখনও সে জানতো না তার জীবনে কি আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে! ইলমি তাকে একটি বড় গাড়ির সামনে এনে দাঁড় করালো। বলল তার ভাই অরিনের সাথে কথা বলতে চায়। অরিনের অবাক লাগল। কি এমন কথা যা ঘরের বাহিরে এনে এভাবে বলতে হবে? তাছাড়া ইলমির ভাইয়ের সাথে অরিনের আলাপ হয়েছে মাত্র একবার। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার মতো কোনো পরিচয়ই তৈরী হয়নি। তবুও অরিন গাড়িতে উঠে বসল। ইলহানের অবস্থা তখন দিশেহারা।
দিকভ্রান্তের মতো উশখুশ করেই যাচ্ছিল। আসল কথা মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না কিছুতেই। এক পর্যায় অরিন নিজেই বুঝতে পারল। মৃদু হেসে বলল," মা কখনোই রাজি হবেন না ইলহান সাহেব।" ইলহান উতলা গলায় বলল," আপনি রাজি তো?" অরিন নিশ্চুপ হয়ে গেল। কি উত্তর দিবে? এতোবড় স্বপ্ন তো সে কল্পনাতেও দেখেনি। নীরবতাকে সম্মতির লক্ষণ বুঝে নিয়েই অরিনের হাতের উল্টোপিঠে চু'মু দিল ইলহান। অরিন কেঁপে উঠল। ইলহান শক্ত করে তার হাতটা ধরল। আশ্বস্ত করে বলল," এবার শুধু দেখুন আমি কি করি।" অরিন অজান্তেই ভরসা পেল। দৃঢ় কিছু অনুভূতি মনের দুয়ারে ঠাঁই নিল। আস্থা গড়ে উঠল। অরিনকে গাড়িতে বসিয়ে রেখেই ইলহান সোজা চলে গেল অরিনদের বাড়ির বৈঠকঘরে। যেখানে কাজীসাহেব, অরিনের হবুবর এবং অরিনের মা হালিমার পাশাপাশি আরও কিছু মানুষ উপস্থিত ছিল। সবার সামনেই ইলহান বলল," আন্টি, একটু বাইরে আসবেন? কথা ছিল।" হালিমা অপ্রতিভ হলেন। প্রশ্ন করলেন," তুমি কে?" "
আমি ইলমির বড়ভাই। ইলহান।" " ও।" হালিমা বাইরে এলেন ইলহানের সাথে। ইলহান তখন সবচেয়ে ভয়ংকর কান্ডটি করল। হাঁটু গেঁড়ে হালিমার সামনে বসে হাতজোড় করে বলল," আমি অরিনকে বিয়ে করতে চাই৷ এই বিয়েটা আপনি ভেঙে দিন। প্লিজ নিষেধ করবেন না। আমি অরিনকে ছাড়া এখান থেকে কিছুতেই যাবো না। হয় আমার লা'শ যাবে নয়তো অরিনসহ আমি।" হালিমা হতভম্ব হয়ে গেলেন৷ মাথা ঝিম ধরে এলো।কয়েক মুহূর্ত পুরোপুরি স্তব্ধ রইলেন। এক পর্যায় ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হলো খুব। চোখ দু'টো যেন জলাশয়।চেহারা থেকে উজ্জ্বল আভা ঠিকরে বের হচ্ছে। হালিমা চাঁদের মতো দেখতে ছেলেটিকে ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। কিন্তু হাসাদকেই বা নিষেধ করবেন কিভাবে?
শেষমেষ অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। ইলহানকে বললেন," আমার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাও।" ইলমি পাশেই দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। এই কথা শোনার পর ভাই-বোন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। ঝড়ের বেগে গাড়িতে উঠে অরিনকে নিয়ে রওনা হলো। সেই ঝমঝমে বৃষ্টির রাতে কাগজ-কলম আর কালিমাকে সাক্ষী রেখে ইলহান-অরিন আবদ্ধ হলো পবিত্র বন্ধনে। কিন্তু ঝামেলা তো তখনও শেষ হয়ে যায়নি। হাসাদ অরিনদের বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে চলে গেল। শপথ করল কিছুতেই অরিনের পরিবারকে এই এলাকায় টিকতে দিবে না। আর সবচেয়ে বড় ঝামেলা শুরু হলো অরিন শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার পর। মিসেস ইলোরা পুত্রবধূকে দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। যা অরিনের জন্য চূড়ান্ত অপমানজনক ঘটনা।
লিখা- Sidratul Muntaz

