শেষ বিকেলের আলো | একমাত্র রুটি বিক্রেতা
শেষ বিকেলের আলো
গ্রামের নাম ছিল শান্তিপুর। নামের মতোই গ্রামটি ছিল শান্ত, নিরিবিলি আর সবুজে ঘেরা। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট নদী। ভোরবেলা নদীর পাড়ে কুয়াশা নেমে আসত, আর সূর্যের প্রথম আলো পড়তেই মনে হতো যেন প্রকৃতি নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছে।
সেই গ্রামেই বাস করত এক দরিদ্র কৃষকের ছেলে—আরিফ। ছোটবেলা থেকেই আরিফ ছিল সৎ, পরিশ্রমী এবং স্বপ্নবাজ। তার বাবা তাকে সবসময় বলতেন, "মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, তার চরিত্র।"
আরিফ যখন মাত্র বারো বছরের, তখন তার বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও সে স্কুল ছাড়েনি। দিনের বেলা অন্যের জমিতে কাজ করত, আর রাতে কুপির আলোয় পড়াশোনা করত।
গ্রামের অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত।
— "এই ছেলে পড়ে কী হবে?"
— "শেষ পর্যন্ত তো লাঙলই ধরতে হবে।"
কিন্তু আরিফ কখনো কারও কথায় ভেঙে পড়েনি।
একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাকে ডেকে বললেন,
"তোমার চোখে আমি এমন এক আগুন দেখি, যা একদিন তোমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। শুধু থেমে যেও না।"
এই কথাগুলো আরিফের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
ঠিক সেই সময় গ্রামের একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এলেন। তিনি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক। নিজের বহু বছরের সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা আরিফকে দিয়ে বললেন,
"আমি হয়তো আর বেশি দিন বাঁচব না। কিন্তু তোমার স্বপ্ন যেন বেঁচে থাকে।"
চোখের পানি লুকিয়ে আরিফ শহরে চলে গেল।
শহরের জীবন ছিল কঠিন। সকালে সংবাদপত্র বিলি করত, দুপুরে ক্লাস করত, রাতে একটি ছোট রেস্টুরেন্টে কাজ করত। অনেক দিন ঠিকমতো খেতেও পারেনি। কখনো কখনো ক্ষুধার কষ্ট নিয়ে লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করত।
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। তখন একটি ছোট ছেলে তাকে একটি ছাতা এগিয়ে দিয়ে বলল,
"ভাইয়া, আমার বাসা কাছেই। আপনি নিয়ে যান।"
আরিফ অবাক হয়ে গেল। পৃথিবীতে এখনো নিঃস্বার্থ মানুষ আছে।
সে বুঝতে পারল—ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না। একদিন না একদিন তা অন্য কারও মাধ্যমে ফিরে আসে।
বছর পাঁচেক পর আরিফ সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রথম হলো। সংবাদপত্রে তার ছবি ছাপা হলো।
যারা একদিন তাকে নিয়ে হাসত, তারাই আজ বলল,
"আমরা জানতাম, ছেলেটা একদিন বড় হবে।"
আরিফ শুধু মুচকি হেসেছিল। কারণ সে জানত, সফলতার পরে মানুষ অনেক কথা বলে; কিন্তু ব্যর্থতার সময় পাশে দাঁড়ায় খুব কম মানুষ।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সে নিজের গ্রামের জন্য কাজ শুরু করল। গ্রামের স্কুলে নতুন ভবন নির্মাণ করল, একটি লাইব্রেরি তৈরি করল, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করল।
একদিন সেই বৃদ্ধ শিক্ষক, যিনি তাকে সাহায্য করেছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন।
আরিফ নিজে গিয়ে তার চিকিৎসার সব দায়িত্ব নিল।
বৃদ্ধ শিক্ষক দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
"আমি তোমাকে টাকা দিয়েছিলাম। তুমি আমাকে সম্মান ফিরিয়ে দিলে।"
আরিফ উত্তর দিল,
"আপনি যদি সেদিন বিশ্বাস না করতেন, তাহলে আজ আমি এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।"
সময় আবার এগিয়ে চলল।
বছর কুড়ি পরে আরিফ গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ হয়ে উঠল। কিন্তু তার ঘরের দেয়ালে এখনো বাবার একটি পুরোনো ছবি ঝুলে ছিল। প্রতিদিন সকালে বের হওয়ার আগে সে ছবিটির দিকে তাকিয়ে বলত,
"আজও আমি আপনার শেখানো পথেই হাঁটছি।"
এক সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখছিল আরিফ। লাল আকাশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
তার মনে হলো, মানুষের জীবনও ঠিক সূর্যাস্তের মতো। একদিন সবাই চলে যাবে। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে যদি কারও জীবনে একটু আলো রেখে যাওয়া যায়, সেটাই প্রকৃত সফলতা।
সেদিন সে সিদ্ধান্ত নিল, নিজের সব সঞ্চয় দিয়ে একটি এতিমখানা ও একটি বিনামূল্যের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে।
কয়েক বছর পরে সেই বিদ্যালয় থেকে পড়ে অসংখ্য ছেলে-মেয়ে ডাক্তার, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলো। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল।
একদিন বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে একটি বাক্য লেখা হলো—
"স্বপ্ন কখনো দরিদ্র হয় না; দরিদ্র হয় শুধু সাহস হারিয়ে ফেলা মানুষ।"
বৃদ্ধ বয়সে আরিফ আবার সেই নদীর পাড়ে গেল, যেখানে ছোটবেলায় বসে সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত।
হালকা বাতাস বইছিল। দূরে শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।
তার চোখে জল চলে এল। দুঃখের নয়, তৃপ্তির।
কারণ সে বুঝেছিল—জীবনের আসল অর্থ বড় বাড়ি, অনেক টাকা বা খ্যাতির মধ্যে নয়; বরং এমন কিছু করে যাওয়ার মধ্যে, যা মানুষের হৃদয়ে বহু বছর বেঁচে থাকে।
সেদিন সূর্য ডুবে গেল। কিন্তু আরিফের রেখে যাওয়া আলো নিভল না। সেই আলো নতুন প্রজন্মের স্বপ্নে, সাহসে এবং সততায় জ্বলতে থাকল—একটি প্রদীপ থেকে আরেকটি প্রদীপে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

